মৌলভীবাজারে সরাইল ট্রাজেডির পুনরাবৃত্তি রুখে দিলেন র‍্যাব-৯

    0
    21

    “অন্যান্য কর্মকর্তা ও সদ্যস্যসহ উপস্থিতদের একজন এএসপি শামীম আনোয়ার।তার মত সাহসী যোদ্ধা যার রাত জেগে অক্লান্ত পরিশ্রম এবং সেহেরিবিহীন রোজা রাখাই আরেকটি সরাইল পরিস্থিতি প্রতিরোধের উপাখ্যান তৈরি করলো”

    জহিরুল ইসলাম,স্টাফ রিপোর্টারঃ পৃথিবীব্যাপী কোভিড-১৯ করোনা ভাইরাসের ছোবলে যখন দিশেহারা অগণিত মানুষ তখন বাংলাদেশও এই মহামারীর আঘাতে জর্জরিত। সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলার একটি জানাজায় সরকারের স্বাস্থ্য বিধি,লকডাউন উপেক্ষা করে স্থানীয় প্রশাসনের দুর্বলতায় এবং মুসুল্লিদের কেহ কেহ টুপি-পাঞ্জাবি লুকিয়ে রেখে ছদ্মবেশ ধারণ করে হবিগঞ্জ জেলাসহ বি-বাড়িয়া থেকে হাজারো মানুষের ওই মাওলানার জানাজায় উপস্থিতি লাখো মানুষকে মহামারীর দিকে ঠেলে দিয়ে দেশব্যাপী সকল মহলে সমালোচনার ঝড় বইয়ে দিয়েছে এমনকি শঙ্কিত করে তুলেছে পুরো জাতিকে। এরই পুনরাবৃত্তি ঘটতে চলছিল মৌলভীবাজার জেলায়ও। বিপুল পরিমাণ লোকসমাগমের শঙ্কা ও অনিশ্চয়তাকে পাশ কাটিয়ে নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হলো মৌলভীবাজার জেলার বরুনা মাদ্রাসার মুহাদ্দিস মাওলানা আব্দুল মুমিতের দাফন প্রক্রিয়া। বুধবার (২৯এপ্রিল,২০২০) ভোর ৪ টা ৩০ ঘটিকায় মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ঢেওপাশা গ্রামে মরহুমের বাড়ির উঠানে দুই শতাধিক মুসল্লির উপস্থিতিতে নামাজে জানাযা শেষে মৃতদেহ সসম্মানে কবরস্থ করা হয়।

    কবর খনন তদারকি করছেন এ এস পি আনোয়ার হোসেন শামিম ও স্থানীয় গণ্যমান্য মুরুব্বিসহ অন্যান্যরা।

    জামেয়া লুৎফিয়া আনওয়ারুল উলুম হামিদ নগর বরুনা মাদরাসার মুহাদ্দিস পদে দীর্ঘ ৩০ বছর যাবৎ দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন শায়খুল হাদিস আল্লামা আবদুল মুমিত ঢেউপাশি। বহুদিন এই মাদ্রাসায় দায়িত্বরত থাকায় এলাকার সাধারণ জনগনের মধ্যে তার ভিন্নরকম একটি গ্রহণযোগ্যতা ছিল। বিপুল পরিমাণ ভক্তবৃন্দের পাশাপাশি ছিল অসংখ্য প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী। মূলত এই কারনেই তার জানাযা কেন্দ্রিক ব্যপক লোকসমাগমের সম্ভাবনা তৈরি হয়। দেখা দেয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল ট্রাজেডির পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনাও।

    কিন্তু র‍্যাব, পুলিশ ও প্রশাসনের কড়া নজরদারি ও রাত জেগে সময়োচিত সিদ্ধান্তের কারনে কোন রকম অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির উদ্ভব ছাড়াই লাশ দাফন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।

    এক্ষেত্রে র‍্যাব-৯ শ্রীমঙ্গল ক্যাম্পের কমান্ডার এএসপি মো. আনোয়ার হোসেন শামীম’র তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকে সাধুবাদ জানিয়েছেন এলাকাবাসী,স্থানীয় মুরুব্বিসহ সচেতন মহল। তার তৎপরতা ও ব্যবস্থাপনায়ই সকালের জন্য অপেক্ষা না করে ভোর থাকতেই জানাযা ও দাফন শেষ করে মৃতের পরিবার।এ সময় রাত জেগে কবর খননসহ জানাজায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চক বেঁধে দাঁড়াতে সকল মুসুল্লিকে অনুপ্রাণিত করেন।

    জানাজায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে মুসুল্লিদের অনুরোধ করছেন এএসপি আনোয়ার হোসেন শামিম,অধিনায়ক র‍্যাব-৯

    প্রসঙ্গত,জানাজা নামাজ মুলত ফরজে কেফায়া,যা কিছু সংখ্যক লোক আদায় করলেই মৃত ব্যাক্তির অধিকার ও জীবিতদের হক আদায় হয়ে যায়।

    পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গতকাল (মঙ্গলবার) দুপুরে মাথায় তীব্র যন্ত্রণা অনুভব করলে মুহাদ্দিস আব্দুল মুমিতকে দ্রুত সিলেটে মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে নিয়ে যান তার স্বজনরা। সেখানে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। সিলেট থেকে মৌলভীবাজারে লাশ আনার পর দাফনের পূর্বপর্যন্ত সারারাত ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে দাফন প্রক্রিয়ায় ভূমিকা পালন করেন র‍্যাব-৯, শ্রীমঙ্গল ক্যাম্পের কমান্ডার এএসপি মো. আনোয়ার হোসেন শামীম। রাতভর নির্ঘুম দায়িত্ব পালনের পর সেহেরি খেতে যেতে না পারায় শুধু পানি পান করেই রোজা রাখেন এ র‍্যাব কর্মকর্তা ও সাথে থাকা অন্যান্য র‍্যাব সদস্যরা।

    এ প্রসঙ্গে এএসপি আনোয়ার বলেন, “আসলে ওই সময় বাসায় যেয়ে সেহেরি খাওয়ার মতো সময় ও পরিস্থিতি ছিল না। কারন সিদ্ধান্ত হয়েছিলো, ফজরের নামাজের পরপরই দাফন প্রক্রিয়া শেষ করে ফেলা হবে। যদি ওই মুহূর্তে আমরা সেহেরি খেতে আসতাম, এর মধ্যেই বিপুল জনতা জানাযার জন্য উপস্থিত হয়ে যেতে পারতো এবং অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টির সম্ভাবনাও থাকতো। তাই সেহেরি খেতে না পারলেও আমি এটা ভেবেই খুশি যে, অবশেষে সবকিছু কোনরকম অপ্রীতিকর পরিস্থিতি না ঘটেই সুসম্পন্ন হয়েছে “।

    এএসপি আনোয়ারের প্রত্যক্ষ ভূমিকায় উঠানে স্বল্পসংখ্যক লোকের উপস্থিতিতে জানাযা সম্পন্ন হয়। এমনকি জানাযার লাইনে দাড়ানোর পরও তিনি উপস্থিত মুসল্লিদেরকে তিন ফুট দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়ানো নিশ্চিত করেন এবং অতিরিক্ত মানুষজনকে উঠান থেকে চলে যেতে অনুরোধ জানান। তার সপ্রতিভ ও সক্রিয় ভূমিকার প্রতি উপস্থিত মুসল্লিদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয় বারবার।

    সেহাব উদ্দিন নামে এক লোক জানান, ফেইসবুকে বুধবার দুপুর ২ টায় কেহ আবার সকাল ৬ টায় জানাজার সময় দিয়েছিলো আমরাও প্রস্তুতি নিয়েছিলাম জানাজায় সময়মত যেতে। এর মধ্যে ভোরে একাধিক ফেইজবুক স্ট্যাটাসে লিখেছে ভোর বেলায় জানাজা সম্পন্ন হয়ে গেছে।কেন এত তাড়াতাড়ি হল জানতে চাইলে এক ফেইসবুক ফ্রেন্ড জানান,র‍্যাব কর্মকর্তার কারণেই সময় চেঞ্জ করা হয়েছে যাতে সরাইলের অবস্থা না হয়, তিনি কোন মতেই রাত পোহাতে সম্মত হয়নি। এ সময় জেলা পুলিশের অফিসাররাও উপস্থিত ছিলেন।

    এছাড়াও স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন৷ উল্লেখ্য, সম্প্রতি বিভিন্ন মানবিক কাজের মাধ্যমে দেশব্যাপী আলোচনায় আসেন শ্রীমঙ্গল র‍্যাব ক্যাম্পের কমান্ডার এএসপি মো. আনোয়ার হোসেন শামীম। তিনি ৩৪ তম বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডার ব্যাচের একজন কর্মকর্তা।