ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নিহত-৫, হাটহাজারিতে রাস্তায় দেয়াল,ভাঙ্গা থানায় হামলা

0
60

নুরুজ্জামান ফারুকীঃ  গত শুক্রবার শহরজুড়ে মাদ্রাসাছাত্রদের তা-বের পর গতকাল শনিবার তাদের সঙ্গে পুলিশ-বিজিবি-ছাত্রলীগের সংঘর্ষে রক্তাক্ত হলো ব্রাহ্মণবাড়িয়া। গতকাল জেলার বিভিন্ন স্থানে এসব সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নন্দনপুরে সন্ধ্যার দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে পাঁচজন নিহত হন। গতকালও হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা, বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন। এসব ঘটনায় ২৫ পুলিশসহ অন্তত শতাধিক লোক আহত হয়েছেন।

নিহতরা হলেন, নন্দনপুর হারিয়া গ্রামের আবদুল লতিফ মিয়ার ছেলে ওয়ার্কশপের দোকানি জুরু আলম (৩৫), বারিউড়া মৈন্দ গ্রামের জুরু আলীর ছেলে সুজন মিয়া (২২), সদর উপজেলার কাউসার মিয়া (২৪) ও জোবায়ের (১৪) এবং সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার দাবিড় মিয়ার ছেলে শ্রমিক বাদল মিয়া (২৪)। এ ছাড়া গুলিবিদ্ধ অবস্থায় নুরুল আমিন, বাছির মিয়া ও ছাদেক মিয়া নামে তিনজনকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের বিরুদ্ধে গত শুক্রবার চট্টগ্রামের হাটহাজারী বড় মাদ্রাসার ছাত্ররা ব্যাপক ভাঙচুর চালালে পুলিশের গুলিতে ৪ জন নিহত হয়। এ ছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে সরকারি স্থাপনায় ব্যাপক ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ করে টিএ রোডের জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসার ছাত্ররা। এ সময় গুলিতে মারা যান এক যুবক। ঢাকায় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে জুমার নামাজের পর হেফাজত কর্মীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সংঘর্ষে অন্তত ৬০ জন আহত হন। এসব ঘটনায় গতকাল বিক্ষোভ কর্মসূচি ছিল কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামীর।

বিক্ষোভ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নন্দনপুরে গতকাল সন্ধ্যায় কয়েক হাজার হেফাজত কর্মী ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে অবস্থান করে। এ সময় পুলিশ-বিজিব সদস্যরা সেখানে গেলে উত্তেজনা দেখা দেয়। একপর্যায়ে হেফাজত কর্মীদের সঙ্গে স্থানীয় কিছু লোকও যোগ দেয়। তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ঘিরে ফেলে। বেগতিক এ অবস্থায় পুলিশ-বিজিবি সদস্যরা গুলি ছোড়েন। এতে হতাহতের ঘটনা ঘটে।

এ ছাড়া বিকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের টিএ রোড দিয়ে আওয়ামী লীগের একটি র‌্যালি জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসার এলাকা অতিক্রম করার সময় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। মিছিলটি মাদ্রাসা অতিক্রম করার সময় কয়েক ছাত্রকে ধাওয়া দিলে ছাত্ররাও পাল্টা ধাওয়া দেয়। এ সময় মিছিল থেকে অর্ধশত ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। কিছুক্ষণ পর কান্দিপাড়া মসজিদ থেকে মাদ্রাসা রক্ষার জন্য মসজিদের মাইক থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়। এতে স্থানীয় বাসিন্দার রাস্তায় নেমে পড়ে। তখন ছাত্রলীগ কর্মীরা পিছু হটে। ক্ষুব্ধ লোকজন প্রধান সড়ক অবরোধ করে রাস্তায় আগুন ধরিয়ে দেয় এবং যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়। এ সময় শহরের দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। পরে বিজিবি সদস্য ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সন্ধ্যার পর শহরের মুক্তমঞ্চ ও টিএ রোড এলাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিজিবি ফাঁকা গুলি ছোড়ে।

অন্যদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল

উপজেলায় বিকালে মাদ্রাসাছাত্র ও স্থানীয়দের বের করা বিক্ষোভ মিছিল থেকে অরুয়াইল পুলিশ ক্যাম্পে হামলা চালানো হয়েছে। এতে ক্যাম্পে থাকা ২৫ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। পরে কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে পুলিশ।

সরাইল থানা পুলিশের পরিদর্শক (তদন্ত) কবির হোসেন জানান, বিক্ষোভ মিছিল থেকে হঠাৎ করে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা চালানো হয়। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।

হাটহাজারীতে দেয়াল তুলে সড়ক অবরোধ

চট্টগ্রামের হাটহাজারী দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসার (হাটহাজারী বড় মাদ্রাসা) সামনে চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়ক ইটের পাকা দেয়াল তুলে ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে অবরোধ করে রেখেছে হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন ওই সড়ক দিয়ে যাতায়াত করা নাজিরহাট, খাগড়াছড়ি ও রামগড়সহ ৩০ রুটের যাত্রীরা। উভয়পাশে পণ্যবাহী শত শত ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান আটকা পড়েছে।

হাটহাজারী থানা থেকে মাত্র ২০০ গজের দূরত্বে এ দেয়াল প্রকাশ্যে নির্মাণ করা হলেও তাতে বাধা বা ভাঙার উদ্যোগ নেয়নি পুলিশ। অথচ হাটহাজারী থানার পুলিশের পাশাপাশি ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত ২৫০ জন র‌্যাব ও ১০০ বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এদিকে শুক্রবারের হতাহতের পর গতকাল এলাকা থমথমে থাকলেও পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। হাটহাজারী বাজারের সব দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। চট্টগ্রামের হাটহাজারী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহাদাত হোসেন বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে। তবে যানবাহন চলাচল এখনো স্বাভাবিক হয়নি। পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি মোতায়েন আছে।

ঘটনার পর থেকে সমঝোতার লক্ষ্যে দুদফা বৈঠক করেছে প্রশাসন ও হেফাজতে ইসলামী। উভয়পক্ষের সদিচ্ছার প্রতিফলন দেখাতে গিয়ে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত শুক্রবারের ঘটনায় কোনো মামলা করা হয়নি। ময়নাতদন্ত ছাড়াই নিহত চারজনের মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। ছাত্রদের দাবি সত্ত্বেও তাদের জানাজার নামাজ মাদ্রাসার ভেতরে পড়ানো হয়নি।

স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ শুক্রবার রাতে ও গতকাল দুপুরে দুদফা বৈঠক করেন হেফাজত নেতাদের সঙ্গে। গতকাল দুপুরে থানা ভবনে হেফাজতে ইসলামের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ওই বৈঠকে তিনি ছাড়াও চট্টগ্রাম অঞ্চলের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন ও পুলিশ সুপার এসএম রশিদুল হকসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, রাতের মধ্যেই যানবাহন চলাচল শুরু হবে। ওদের (হেফাজতে ইসলাম) সঙ্গে কথা হয়েছে। সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে। আমাদের দুদফা বৈঠক ফলপ্রসূ হয়েছে।

আলোচনা চলার মধ্যেই আগের দিনের মতো গতকালও সকাল থেকে হেফাজতে ইসলামের ব্যানার নিয়ে হাটহাজারী মাদ্রাসার ছাত্ররা হাটহাজারী ত্রিবেণীর মোড় নামক স্থানে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। বিকালে চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়কে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মাদ্রাসায় চলে আসার আহ্বান জানান হেফাজতে ইসলামের আমির জুনায়েদ বাবুনগরী। তার আহ্বানে বেশিরভাগ ছাত্র মাদ্রাসায় ফিরে যান।

ছাত্ররা মাদ্রাসায় ফিরে যাওয়ার পর মাদ্রাসার মাইক থেকে ছয় দফা দাবি উপস্থাপন করা হয়। এগুলো হলো- খুনিদের অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তার, ছাত্র-জনতার ওপর কোনো ধরনের হামলা করা যাবে না, নিহতদের ক্ষতিপূরণ হাটহাজারী প্রশাসনকে বহন করতে হবে, আহতদের চিকিৎসার খরচ সরকারকে বহন করতে হবে, চমেক হাসপাতালে চিকিৎসায় অবহেলার সঙ্গে জড়িত চিকিৎসকদের আইনের আওতায় আনতে হবে এবং হাটহাজারী থানার ওসি রফিকুল ইসলামকে বরখাস্ত করতে হবে। ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, তাদের কিছু দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে এবং বাকিগুলো আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত শুক্রবার দুপুরে হাটহাজারী মাদ্রাসার একদলছাত্র হেফাজতে ইসলামের ব্যানার নিয়ে মিছিল বের করে থানা, ইউনিয়ন ভূমি অফিস ও ডাকবাংলোর ভেতরে ঢুকে তা-ব চালান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ প্রথমে কাঁদানে গ্যাস ও পরে গুলি ছুড়লে মাদ্রাসার ছাত্ররা পিছু হটে মাদ্রাসার মূল ফটকে অবস্থান নিয়ে চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়ক অবরোধ করে। পরে আহতদের হাসপাতালে নেওয়া হলে ৪ জনকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা।

ভাঙ্গায় সংঘর্ষ থানায় হামলা

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলা ঈদগাহ মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে বেলা ৩টায় হেফাজত নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করে। একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় ওসমান ব্যাপারী নামের একজনকে পুলিশ আটক করে। পরে বিক্ষুব্ধরা থানায় হামলা চালায়। এতে ৬ পুলিশ সদস্য আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। ভাঙ্গা থানার ওসি তদন্ত বিকাশ ম-ল বলেন, এ বিষয়ে মামলা করা হবে।আমাদের সময় অবলম্বনে