আইএস’র প্রধান বাগদাদির মৃত্যুতে ট্রাম্পের কৃতিত্বে লাভক্ষতি

    0
    25

    মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গর্বের সঙ্গে দাবি করেছেন, জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস’র প্রধান আবু বকর আল-বাগদাদি তাদের অভিযানে নিহত হয়েছেন। ট্রাম্প দাবি করেন, বাগদাদি কুকুরের মতো মারা গেছেন। ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় পালাতে না পেরে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন। অভিযানে বাগদাদি ও তার তিন ছেলেমেয়েসহ অনেক সন্ত্রাসী নিহত হলেও মার্কিন বাহিনীর কেউ হতাহত হন নি। শুধু মার্কিন বাহিনীর একটি কুকুর কিছুটা ক্ষতির শিকার হয়েছেন।

    ট্রাম্প জানিয়েছেন, প্রচণ্ড বিস্ফোরণে বাগদাদির দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে বাগদাদির নিহতের বিষয়ে তারা নিশ্চিত হয়েছেন। ট্রাম্পের এই তথ্য থেকে এটা স্পষ্ট, আল-কায়েদা প্রধান বিন লাদেনের মতো আইএস প্রধান বাগদাদির মৃতদেহের ছবিও প্রকাশিত হবে না।

    তাহলে ট্রাম্পের এই দাবি কীভাবে বিশ্বাস করব? মার্কিন দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্টের বিভিন্ন বিশ্লেষণেই বলা হচ্ছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিদিন গড়ে আট থেকে দশটি মিথ্যা বলেন। বাগদাদিকে হত্যার দাবিও যে মিথ্যা নয় তার নিশ্চয়তা কোথায়? এর আগে অন্তত আটবার বিভিন্ন গণমাধ্যমে বাগদাদি’র নিহত হওয়ার খবর গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে।

    আগামী বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। মার্কিন জনগণ নানা কারণে ব্যাপকভাবে বিতর্কিত ট্রাম্পকে আবারও ভোট দেবেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। এছাড়া তার সামনে অভিশংসনের আশঙ্কাও রয়ে গেছে। ২০২০ র নির্বাচনে সুবিধা পেতেই তিনি বাগদাদিকে হত্যার দাবি প্রচারের জন্য এ সময়টি বেছে নিয়েছেন। ঠিক একই কাজ করেছিলেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা।

    তিনি ২০১২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে ২০১১ সালে বিন লাদেনকে হত্যার ঘোষণা দেন। বিন লাদেনের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান প্রযুক্তির সাহায্যে নিজে সরাসরি দেখার কথা জানিয়েছিলেন ওবামা। ঠিক একইভাবে ট্রাম্পও দাবি করেছেন, তিনি নিজে প্রযুক্তির সাহায্যে বাগদাদির বিরুদ্ধে অভিযানের একটা অংশ সরাসরি দেখেছেন।

    বিন লাদেন ও বাগদাদিকে হত্যার দাবি সত্য হলেও এটা বলা যায়, এরা দু’জনই আগে থেকেই মার্কিন গোয়েন্দাদের জালের ভেতরেই ছিল। ওবামা ও ট্রাম্প তাদের নির্বাচনী স্বার্থে উপযুক্ত সময়ে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন মাত্র।

    বিন লাদেনকে হত্যার অনেক আগেই খবর বেরিয়েছিল তিনি কোথায় আছেন তা সম্পর্কে মার্কিন গোয়েন্দারা পুরোপুরি অবহিত। ধারণা করা যায় আইএস প্রধান বাগদাদির অবস্থান সম্পর্কেও মার্কিন গোয়েন্দারা আগে থেকেই জানতেন। কারণ আইএস’র অন্তত একাংশের সঙ্গে আমেরিকা-ইসরাইলের একটা গোপন যোগাযোগ ছিল এবং এখনও আছে। সিরিয়ায় মার্কিন বাহিনী ও আইএস উভয়ই আসাদ সরকারকে উৎখাতের জন্য তৎপরতা চালিয়েছে। লক্ষ্য অভিন্ন হওয়ার কারণে তাদের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা অবিশ্বাস্য নয়। ইহুদিবাদী ইসরাইলের বিভিন্ন সূত্র এর আগে সিরিয়ায় তৎপর জঙ্গিদের তাদের হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়ার কথা প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছে।

    বাগদাদিকে হত্যার পর সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প দাবি করেছেন, বাগদাদিকে হত্যার ঘটনা বিন লাদেনকে হত্যার ঘটনার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাগদাদি খেলাফত ঘোষণা করেছিলেন। তার এই তুলনা থেকেও এটা স্পষ্ট তিনি বাগদাদিকে হত্যার দাবির মাধ্যমে বড় ধরণের কৃতিত্ব নিতে চান।

    বাগদাদিকে হত্যার দাবি প্রচার করে ট্রাম্প যেভাবে নিজেকে বীর হিসেবে জাহির করতে চাইছেন তা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ প্রায় দুই বছর আগেই ইরাক ও সিরিয়ায় আইএস’র পতন হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়।

    ২০১৭ সালের ২১ জুন আইএস ইরাকের মসুলে তাদের কথিত খেলাফত ঘোষণার কেন্দ্রস্থল আল-নুরি মসজিদ ধ্বংসের মাধ্যমেই গোটা বিশ্বকে নিজেদের পরাজয়ের বিষয়টি জানিয়ে দেয়। মসজিদটি ইরাকি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার আগে বিস্ফোরকের সাহায্যে তা ধ্বংস করে দেয় আইএস। ওই ঘটনার তিন বছর আগে আল-নুরি মসজিদে দাঁড়িয়ে ইরাক ও সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল অংশকে নিয়ে কথিত খেলাফত প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছিলেন আবু বকর আল-বাগদাদি।

    দুই বছর আগেই যে বাগদাদি গুরুত্ব হারিয়ে অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিলেন সেই বাগদাদিকে এখন হত্যার মাধ্যমে ট্রাম্প অন্তত বীরত্বপূর্ণ কৃতিত্ব দাবি করতে পারেন না। লেখক,রেডিও তেহরানের সিনিয়র সাংবাদিক।