Thursday 3rd of December 2020 10:05:36 AM

নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের বহিস্কৃত সাধারণ সম্পাদক শামিমা নূর পাপিয়া রিমান্ডে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছেন। এরই মধ্যে তার মোবাইল কললিস্ট পরীক্ষা ও জিজ্ঞাসাবাদে একাধিক এমপির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ পরিচয় থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া আওয়ামী যুব মহিলা লীগের ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি ও সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক এমপি সাবিনা আক্তার তুহিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল পাপিয়ার। নানা তদবির ও কাজ বাগিয়ে নিতে প্রভাবশালীদের নাম-পরিচয় ব্যবহার করতেন তিনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র সমকালকে এসব তথ্য জানায়।
এদিকে পাপিয়ার অবৈধ সম্পদের খোঁজ নিচ্ছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি। এ ঘটনায় মানিলন্ডারিং আইনে মামলার তদন্ত করবে তারা।
গত রোববার পাপিয়া ও তার স্বামী মফিজুর রহমান ওরফে মতি সুমন চৌধুরীকে তিন মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১৫ দিনের পুলিশ হেফাজতে পাঠিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া তাদের সহযোগী সাব্বির খন্দকার ও শেখ তায়ি্যবাকে এক মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠানো হয়েছে। নানা অপকর্মের ব্যাপারে বিমানবন্দর থানা পুলিশ পাপিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।
এদিকে, পাপিয়ার তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর সারাদেশে যুব মহিলা লীগের আর কারা অপকর্মে জড়িত, তাদের খুঁজে বের করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। গতকাল বুধবার দুপুরে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেন সংগঠনটির সভাপতি নাজমা আক্তার ও সাধারণ সম্পাদক অপু উকিল।
সাক্ষাতের পর তারা সমকালকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তাদের কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন সারাদেশে যুব মহিলা লীগের নেতাকর্মীদের খোঁজ নিতে; কারা কারা অপকর্মের সঙ্গে জড়িত, তাদের খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নিতে। এ ছাড়া গোয়েন্দা রিপোর্ট দেখে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। যাচাই-বাছাই করে চালনি দিয়ে ছেঁকে দুষ্ট চক্রকে সংগঠন থেকে বের করতে বলেন তিনি। এ ছাড়া ভবিষ্যতে যাতে কেউ অপকর্মে জড়িয়ে সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে না পারে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকার নির্দেশনাও দেন প্রধানমন্ত্রী।
জানা গেছে, গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতে প্রথমেই নাজমা আক্তার ও অপু উকিল পাপিয়ার অপকর্ম ও গ্রেপ্তারের বিষয়টি তুলে ধরেন। এ ঘটনায় তারা লজ্জিত বলে জানিয়ে করণীয় নিয়ে দলীয়প্রধানের নির্দেশনাও চান। জবাবে অপকর্মে জড়িতদের চিহ্নিত করে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় সংগঠনের এই দুই শীর্ষ নেত্রী পাপিয়াকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান।
যাদের সহায়তা পেতেন পাপিয়া :জিজ্ঞাসাবাদকারীরা জানান, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিসের বড় বড় কাজ মোটা অঙ্কের কমিশনের ভিত্তিতে পাইয়ে দেওয়ার দেনদরবার করতেন পাপিয়া ও তার স্বামী। যাকে যে কায়দায় ম্যানেজ করা যায়, সেটা ব্যবহার করতেন পাপিয়া। কেউ প্রলোভনের ফাঁদে পা না দিলে তাকে কৌশলে প্রতারণার জালে বন্দি করতেন। একটি সাধারণ পরিবারে বেড়ে ওঠা পাপিয়া পাঁচ বছরে কয়েক কোটি টাকা ও বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন। তাকে রাজধানী ও নরসিংদীতে মাদক-বাণিজ্যে সহায়তা দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন রাজনৈতিক ব্যক্তিরা।
পাপিয়াকে সহায়তা দেওয়ার তালিকায় রয়েছেন সরকারি কর্মকর্তাও। তাদের মধ্যে যুব মহিলা লীগের ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি সাবিনা আক্তার তুহিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কথা স্বীকার করেছেন পাপিয়া। তুহিনের সঙ্গে পাপিয়ার চ্যাটিংয়েও এ বিষয়ক তথ্য উঠে এসেছে। এ ছাড়া যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির দুই শীর্ষ নেত্রীর পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার তথ্য রিমান্ডে উঠে এসেছে। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে কয়েকজন ভিকটিমকে পাপিয়ার মুখোমুখি করা হয়। পাপিয়া তাদের সঙ্গে প্রতারণা করার কথা স্বীকার করেন।
জিজ্ঞাসাবাদে নিয়োজিত সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, নরসিংদীর একজন এমপির সঙ্গেও পাপিয়ার ভালো সম্পর্ক ছিল। বিভিন্ন শ্রেণিপেশার প্র্রভাবশালীর মাধ্যমেই নরসিংদীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বৈধ-অবৈধ গ্যাস সংযোগ এবং লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে চাকরি দিয়ে আসছিলেন তিনি। নিজে নিয়মিত মাদক সেবন করতেন। এ ছাড়া পাঁচতারকা একাধিক হোটেলে নিয়মিত পার্টি দিতেন তিনি। ঢাকা ও নরসিংদীতে একাধিক ফ্ল্যাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক পাপিয়ার বাবা একজন অটো গ্যারেজের মালিক। বাবার সঙ্গে তেমন যোগাযোগ ছিল না।
সাবেক এমপি ও যুব মহিলা লীগের নেত্রী সাবিনা আক্তার তুহিন সমকালকে বলেন, ২০১৭ সালে পাপিয়ার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। এরপর সাংগঠনিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ফোনে কথা হয়। আবার মেসেঞ্জারে চ্যাটিংও হয়। সংগঠনের জেলা নেত্রী হিসেবে তার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিল। তবে তার মধ্যে এমন ‘কুৎসিত’ কিছু রয়েছে তা জানা ছিল না। পাপিয়ার ছবি ফেসবুকে শেয়ার করার পরও কেউ বলেনি যে সে খারাপ। এখন অনেক কিছু জানা যাচ্ছে। ১৪ মাস ধরে তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। কয়েকবার ফোন করলেও পাপিয়া তাতে সাড়া দেয়নি। হয়তো ওর মধ্যে পরিবর্তন হয়েছে বলেই এড়িয়ে চলত। পাপিয়ার সঙ্গে তার গাড়ির ব্যবসা থাকার কথা অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘এটা কেউ প্রমাণ করতে পারবে না। প্রয়োজনে ওর সামনে আমাকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করুক।’
তুহিন আরও বলেন, ‘যাচাই-বাছাই না করে সরল বিশ্বাসে মিশেছি, এটাই আমার দোষ। ও অনেক আগে আমার বাসায় আসত। একবার পাপিয়াকে শাড়ি উপহার দিয়েছিলাম। সংগঠনের নেত্রী হিসেবে সেটা দিতেই পারি। ও একবার আমার কাছে টাকা ঋণ চায়। তবে ওই সময় টাকা না থাকায় দিতে পারিনি। যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়ার পর মনে করেছি টাকা ধার না দেওয়ায় হয়তো আসা-যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।’

  

এডিটর: আনিছুল ইসলাম আশরাফী, এনিমেটরস্ বাংলা মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক প্রকাশিত
সম্পাদকীয় কার্যালয়: কলেজ রোড, শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার।
Email: news.amarsylhet24@gmail.com Mobile: 01772 968 710

Developed By : i-Tech Sreemangal
Email : itech.official@hotmail.com
Facebook : http://facebook.com/itech.ctc