সৌহার্দ্য সম্প্রীতির বন্ধনে বেনাপোলে ”রিট্রেট সেরিমানি”

    0
    23

    বেনাপোল থেকে এম ওসমান: বেনাপোল ও পেট্রাপোল আন্তর্জাতিক চেকপোষ্টের শুন্য রেখায় ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে দুই দেশের ‘জয়েন্ট রিট্রেট সেরিমানি’ নামের অনুষ্টানটি খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বন্ধুত্বের বার্তা নিয়ে পরস্পরের জাতীয় পতাকাকে সন্মান দেখাতে বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্তে ভারত বাংলাদেশ দু’দেশের যৌথ রিট্রেট সেরিমানির শুরু ২০১৩ সালের ০৬ নভেম্বর।

    সেদিনের সেই উদ্বোধনী অনুষ্টানে উপস্থিত ছিলেন, তৎকালিন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খাঁন আলমগীর ও ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুশীল কুমার সিন্ধে। অনুষ্ঠানে বিজিবি ও বিএসএফে’র মহাপরিচালক ছাড়াও উর্ধ্বতন সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন ।

    সেই থেকে প্রতিদিন মাত্র আধা ঘন্টার এ অনুষ্ঠান দু’দেশের বিভিন্ন এলাকার হাজারো মানুষ উপভোগ করেন। তবে জাতীয় দিবসগুলো ও রাস্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি কিম্বা বিশেষ কোন প্রতিনিধি দল সীমান্ত ও বন্দর পরিদর্শনে আসলে বিশেষ অনুষ্টানের আয়োজন করা হয় বলে জানান যশোর-৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল হক ।

    ভারতের আটারী ও পাকিস্থানের ওয়াঘা সীমান্তে চালু হওয়ার ৫৪ বছর পর বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্তে চালু হয় রিট্রেট সেরিমানির অনুষ্টান । এটি ছিল বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে প্রথম।

    জয়েন্ট রিট্রেট সেরিমানি হলো, দু’দেশের সীমান্তরক্ষী বিজিবি ও বিএসএফ বিশেষ পোশাকে একই সময়ে সকাল-সন্ধ্যায় জাতীয় পতাকা উঠানো ও নামানোর আগে বিউগলের সুরে বাজাবে দু’দেশের জাতীয় সংগীত। নাচ গানেরও আয়োজন করা হয়। প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় আমদানি-রফতানি এবং পাসপোর্টযাত্রী চলাচল শুরু হওয়ার আগে শান্তির পতাকা উঠিয়ে বিজিবি ও বিএসএফ সদস্যরা প্যারেড এবং জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন । পরে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রবেশ গেট খুলে দেয়া হয় । আবার সন্ধ্যায় একই নিয়মে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য এবং পাসপোর্ট যাত্রীদের যাতায়াত শেষ হলে পতাকা নামানো ও জাতীয় সংগীত বাজানো হয় । পরে দু’দেশের মধ্যে প্রবেশ গেট আবার বন্ধ করে দেয়া হয় ।

    সরেজমিন দেখা যায়, বেনাপোল সীমান্তের বিজিবি ও ভারতের পেট্রাপোল সীমান্তের বিএসএফ কুচকাওয়াজের মাধ্যমে নিজ নিজ ভূখন্ডে অবস্থান করেন। ঘড়ির কাটায় বিকেল ঠিক ৫টা ২০ মিনিট হওয়ার সাথে সাথে শুরু হয় রিট্রেট সেরিমানির আনুষ্টানিকতা। বিউগলের সুরে বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে শুরু হয় দুই দেশের জাতীয় পতাকা নামানো বা ‘ফ্ল্যাগ ডাউন’-এর আনুষ্ঠানিকতা । এরপর দুই দেশের সীমান্তের শুন্যরেখায় একজন বিএসএফ এসে বিজিবি’র সঙ্গে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে করমর্দন করলেন । এটি যশোরের শেষ সীমান্ত বেনাপোল চেকপোস্টের প্রতিদিনকার চিত্র। যা দেখতে দুই পারের হাজারো মানুষ প্রতিদিন এসে ভীড় জমায় শুন্যরেখায় ।

    দিনের বেলা পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়া সীমান্তের শুন্যরেখায় কেউ যেতে না পারলেও বিকেলের পতাকা নামানোর এই নয়নাভিরাম দৃশ্য সকলের জন্যই উন্মুক্ত করে দিয়েছে বিজিবি ও বিএসএফ ।

    বেনাপোল চেকপোস্ট বিজিবি ক্যাম্পের সুবেদার হারাধন বলেন, ‘রিট্রেট সেরিমানির’ অনুষ্ঠানটি দর্শনার্থীরা যাতে সুন্দর ভাবে উপভোগ করতে পারেন সেজন্য বেনাপোলের শুন্যরেখায় একটি অত্যাধুনিক গ্যালারি তৈরি করা হয়েছে। এতে সাধারন মানুষের জন্য আসন রয়েছে ৩০০ আর ভিআইপি আসন রয়েছে ২০টি । বিএসএফও একটি গ্যালারি নির্মাণ করেছেন। যেখানে বসে এ অনুষ্ঠান সবাই উপভোগ করতে পারেন ।

    ভারতের পেট্রাপোল সিএন্ডএফ স্টাফ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারন সম্পাদক কার্তিক চক্রবর্তী বলেন, কোলকাতা বনগাঁসহ বিভিন্ন প্রদেশের মানুষ ও পর্যটকরা এই অনুষ্ঠান দেখতে প্রতিদিন বিকেলে ভিড় জমায় । ব্যাপক উৎসাহ ভরে তারা অনুষ্টানটি উপভোগ করেন। এটি সীমান্তের একটি জনপ্রিয় অনুষ্টান।

    বেনাপোলের রাফসান জামি রাব্বি বলেন, অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে পতাকা নামানোর এই অনুষ্ঠান অনেকটা দুই বাংলার মিলনমেলায় পরিণত হয় । বনগাঁর বিনয় ভট্রাচার্য্য স্বপরিবারে এসেছেন অনুষ্টানে।

    তিনি বলেন, আমাদের পূর্ব-পুরুষের আদি বাসস্থান বাংলাদেশে। তাদের সাথে দেখা করার জন্য এখানে এসেছি। দূর থেকে দেখেছি ফোনে কথা বলেছি। মাঝে মধ্যে আসি তাদের সাথে দেখা সাক্ষাত হয়, ভালোই লাগে।

    ভারত পাকিস্থান সীমান্তের আটারী ওয়াঘা সীমান্তে ১৯৫৯ সাল থেকে চলে আসছে। ভারতের আটারী ও পাকিস্থান ওয়াঘা সবচেয়ে বড় স্থল সীমান্ত। জয়েন্ট রিট্রেট সেরিমানি প্রথম শুরু হয় ফ্রান্সের সামরিক বাহিনীতে । পরে যুক্তরাস্ট্রের সেনাবাহিনীতে চালু হয়।