সাভারে ভবন ধসে মৃত ২৩০ : ১৫৪০ জীবিত উদ্ধার

    0
    4

    ঢাকা, ২৫ এপ্রিল : সাভারে রানা প্লাজা ধসে আজ বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত ২৩০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ধংসস্তুপের মধ্যে থেকে ১৫৪০ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনার ৩৬ ঘণ্টা পরও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে আছেন বহু মানুষ। আজ বৃহস্পতিবার ভোর থেকেই নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ধসে পড়া রানা প্লাজার সামনে ভিড় করেছেন বহু মানুষ। এদিকে রানার প্লাজার মালিকের ফাঁসির দাবিতে আশুলিয়ায় সড়ক অবরোধ, শ্রমিক পুলিশ সংঘর্ষ ও ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষের আশঙ্কায় ওই এলাকার আশেপাশের সব পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি না থাকায় ধসে যাওয়া ভবনে উদ্ধার কার্যক্রম চলছে ধীরগতিতে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ও সেনা সদস্যরা রাভর এ উদ্ধার অভিযানে অংশ নিলেও স্থানীয় বহু মানুষ এক্ষেত্রে উদ্যোগী ভূমিকা রাখছেন।  

    সাভারে ভবন ধসে মৃত ২৩০ : ১৫৪০ জীবিত উদ্ধার
    সাভারে ভবন ধসে মৃত ২৩০ : ১৫৪০ জীবিত উদ্ধার

    উদ্ধারকাজের তদারকির দায়িত্বে থাকা সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সিদ্দিকুল আলম শিকদার বলছেন, আটকে পড়া সবাইকে উদ্ধার না করা পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকবে। উদ্ধার কাজ পুরোপুরি শেষ হতে দুই-এক দিন লাগতে পারে বলে উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন। ঢাকার জেলা প্রশাসক শেখ ইউসুফ হারুন বলেন,  রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে ২৩০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৭০ জনের মৃতদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে স্বজনদের কাছে। ভবন ধসের কারণ তদন্তে অতিরিক্ত জেলা মেজিস্ট্রেট মনোজ কুমার রায়ের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে। এ কমিটিকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
    অক্সিজেনের অভাবে উদ্ধার কাজ ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন উদ্ধারকারী সদস্য আমির হোসেন। তিনি বলেন, ভিতরে আলো এবং অক্সিজেনের প্রচণ্ড অভাব। আলো ও অক্সিজেনের অভাবের কারণে উদ্ধার কাজ যথাযথ ভাবে চালানো যাচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, ভিতরে অনেক মৃতদেহ আটকে আছে। সেগুলো থেকে পঁচা গন্ধ বের হচ্ছে। অক্সিজেন ও আলোর অভাবে আমরা সেখানে যেতে পারছি না। উদ্ধার কাজ চালাতে পারছি না। তবে বিমান বাহিনীর কয়েকটি অক্সিজেনবাহী গাড়ি আসলেও অন্যকোনো বাহিনীর অক্সিজেনবাহী গাড়ি সেখানে আসেনি। ফলে অক্সিজেনের অপ্রতুলতা দেখা দিয়েছে। এদিকে ভেতরে অক্সিজেনের অভাবের কারণে জীবিত আহতদেরও নাজুক অবস্থা। আমির হোসেন বলেন, যদি ভেতরে আলো, পানি ও অক্সিজেনের ব্যাবস্থা করা যায় তাহলে আটকে পড়া আহতদের জীবিত উদ্ধার করার সম্ভাবনাও বেড়ে যেত।
    সাভারে বহুতল ভবন রানা প্লাজার ধ্বংসাবশেষ থেকে জীবিতদের হাত-পা কেটে বের করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সকালে এভাবে পাঁচজনকে উদ্ধার করা হয়েছে। হাত-পা কেটে জীবিতদের উদ্ধার করতে গণস্বাস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢাকার হাসপাতাল থেকে সাতজন সিনিয়র চিকিৎসক এরই মধ্যে সাভারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছেন। গণস্বাস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দেলোয়ার হোসেন বলেন, সকালে পাঁচজনকে হাত পা কেটে উদ্ধার করা হয়েছে। এ ধরনের মানুষকে উদ্ধারে আমাদের আরও সার্জন ও অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রয়োজন। এজন্য গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ধানমন্ডি হাসপাতাল থেকে আরও সাতজন সিনিয়র চিকিৎসক সাভারের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেছেন। আরও ৪ থেকে ৫ জন মানুষকে হাত পা কেটে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব। তিনি জানান, গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ৯টা থেকে গণস্বাস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫ থেকে ৩০ একটি মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আর পুরো ব্যবস্থাপনার তদারকি তিনি নিজেই করছেন। গণস্বাস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্য সেবার পাশাপাশি খাবার স্যালাইন, স্যালাইনসহ সব ধরনের চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন। এদের পাশাপাশি কাজ করছেন রেড ক্রিসেন্টের কর্মীরা। তবে উদ্ধার কাজে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন গার্মেন্টেসের আটকে পড়াদের সহকর্মী ও স্থানীয়রা। তারা ভবনের ভেতরে ছোট সুড়ঙ্গ দিয়ে জীবিতদের উদ্ধারের চেষ্টা করছে। উদ্ধার করছে মৃতদেরও।
    আশুলিয়ায় সড়ক অবরোধ, শ্রমিক পুলিশ সংঘর্ষ ও ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। আজ বৃহস্পতিবার সকালে আশুলিয়ার জামগড়া এলাকার বিভিন্ন গার্মেন্টেসের পোশাক শ্রমিকরা সাভারের রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানার ফাসির দাবিতে আব্দুলপুর-বাইপাইল সড়ক অবরোধ করলে এ ঘটনা ঘটে।
    শ্রমিক ও পুলিশ সুত্রে জানা গেছে, আজ বৃহস্পতিবার সকাল  সাড়ে ৮টার দিকে আশুলিয়ার জামগড়া ও জিরাবো এলাকায় শ্রমিকরা কারখানায় কাজে যোগ দিতে এসে কারখানার বাইরে সড়ক অবরোধ করে। এ সময় তারা সাভারে ভবন ধসে পোশাক শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনায় ভবন মালিক সোহেল রানাকে ফাঁসির দাবিতে আব্দুল্লাপুর-বাইপাইল সড়ক অবরোধ করে। পরে খবর পেয়ে আশুলিয়া শিল্প পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌছে শ্রমিকদের সড়ক থেকে সড়িয়ে দিতে চাইলে। শুরু হয় শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া। পরে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ এসে বেশ কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়া হয়।
    এ ব্যাপারে আশুলিয়া শিল্প পুলিশের উপপরিদর্শক ফয়েজুল কবির ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, সোহেল রানার ফাসির দাবিতে শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করে। এ সময় শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরে যেতে বললে শ্রমিকরা ক্ষিপ্ত হয়ে ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে। পরে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ এসে বেশ কয়েকরাউন্ড টিয়ারশেল ছুড়ে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়া হয়। যে কোন অপ্রীতিক ঘটনার আশঙ্কায় ওই এলাকার সব কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
    ভবন ধসে ব্যাপক হতাহতের ঘটনায় আজ বৃহস্পতিবার সারাদেশে জাতীয় শোক পালন করা হচ্ছে। নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের উদ্দেশে সব সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ভবনে এবং বিদেশের বাংলাদেশ মিশনসমূহে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রয়েছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিশেষ দোয়া ও প্রার্থনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে ছুটি ঘোষণা করা হয়নি। ফলে অফিস আদালত ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা রয়েছে। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় শোক পালনের এ ঘোষণা দেন।
    সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকার নয় তলা ‘রানা প্লাজা’, মঙ্গলবার ফাটল ধরার পর গতকাল বুধবার সকাল ৯টার দিকে ভবনটি ধসে পড়ে। ভবনটির প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় ইলেকট্রনিক্স, কম্পিউটার, প্রসাধন সামগ্রী ও কাপড়ের মাকের্ট এবং ব্র্যাক ব্যাংকের একটি শাখা ছিল। আর তৃতীয় থেকে ষষ্ঠ তলা পর্যন্ত ছিল চারটি পোশাক কারখানা। নয় তলা ভবনের চারটি তলায় পাঁচটি পোশাক কারখানায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার শ্রমিক কাজ করছিলেন ঘটনার সময়।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here