মা বাবাকে ৩পাতা করে ঘুমের ওষুধ চায়ের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়ায় ঐশীর স্বীকারোক্তি

    0
    6

    আমার সিলেট ডেস্ক, ২৫ আগস্ট : বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশায় ও মাদক সেবন বাধা হয়ে দাঁড়ানোর কারণে ঠাণ্ডা মাথায় নিজ হাতেই তার বাবা-মাকে খুন করেছে বলে আদালতকে জানিয়েছে ঐশী। পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) ইন্সপেক্টর মাহফুজ ও তার স্ত্রী স্বপ্না খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার তাদের মেয়ে ঐশী রহমান ও কাজের মেয়ে সুমি শনিবার আদালতে এ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দিতে ঐশী বলেছে, আমি নিজ হাতে বাবা-মাকে খুন করেছি। অন্যদিকে সুমি জানায়, লাশ সড়াতে সে ঐশীকে সহযোগিতা করেছে। শনিবার বিকেলে ৪টার দিকে আদালতে তাদের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে। এর পর আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
    এদিকে শনিবারের সর্বশেষ খবরে জানা যায়, আদালতের নির্দেশে ঐশী রহমানকে পুলিশ কাস্টরি থেকে গাজীপুরের কোণাবাড়ীর কিশোর সংশোধনী কেন্দ্রে নেয়া হচ্ছে। শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মাহবুবুর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। পক্ষান্তরে এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অভিযোগে ঐশী রহমানের বন্ধু মিজানুর রহমান ওরফে রনিকে শনিবারে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয়ার আদেশ দিয়েছেন মহানগর হাকিম আসাদুজ্জামান নুর।
    এর আগে নিহত পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমানের মেয়ে ঐশী রহমানকে পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে শনিবারে আদালতে হাজির করা হয়। এর পর ঢাকার কিশোর আদালতের বিচারক মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আনোয়ার সাদাত তাদের স্বীকারোক্তি গ্রহণ সূত্র জানিয়েছে, ঐশী ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। মহানগর হাকিম আনোয়ার সাদাতের খাস কামরায় তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে। ওই আদালতে পুলিশের সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা উপপরিদর্শক আব্দুল গাফফার বলেন, ঐশীর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেয়া হয়েছে।
    আদালত সূত্রে জান যায়, শনিবার বেলা ১২টার দিকে স্বীকারোক্তি গ্রহণের জন্য ঐশী ও সুমিকে ম্যাজিস্ট্রেট আনোয়ার সাদাতের আদালতে হাজির করা হয়। ওই সময় ম্যাজিস্ট্রেট ঐশী ও সুমিকে স্বীকারোক্তি করবে কি না তা নিয়ে ভাবতে ৩ ঘণ্টা সময় দেন। এরপর স্বীকারোক্তি দিতে সম্মত হওয়ায় বেলা ৩টা থেকে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ঐশীর এবং বেলা সাড়ে ৪টা থেকে সাড়ে ৫টা পর্যন্ত সুমির স্বীকারোক্তি লিপিবদ্ধ করেন বিচারক। স্বীকারোক্তি শেষে উভয়কে জেলহাজতে পাঠানো হয়।
    আদালতকে ঐশী জানায়, মাদক সেবন ও বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশায় বাধা হয়ে দাঁড়ানোর কারণে একাই সে তার মা-বাবাকে চাকু দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করে হত্যা করে।ঐশী বলে, বেশ কিছু দিন আগে থেকেই সে তার মা-বাবাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। এ নিয়ে সে তার বন্ধুদের সঙ্গেও আলাপ করে।
    খুনের বর্ণনা দিতে গিয়ে ঐশী জানায়, বন্ধুরা তাকে শেল্টার দেয়ার আশ্বাস দেয়। এ শেল্টারের আশ্বাস পেয়ে ঘটনার দিন সে ৬ পাতা ঘুমের ওষুধ বাসায় নিয়ে আসে। রাতে বাবা ও মা উভয়কে ৩ পাতা করে ঘুমের ওষুধ চায়ের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়ায়। মা-বাবাকে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানোর পর উভয়ই যখন অচেতন হয়ে পড়ে তখন সে প্রথমে মাকে হত্যার জন্য চাকু দিয়ে আঘাত করে। মাকে হত্যা নিশ্চিত করার পর অচেতন বাবাকে চাকু দিয়ে একবার আঘাত করার পর মা জেগে ওঠে এবং ঐশীর কাছে পানি খেতে চায়।
    ঐশী জানায়, এরপর সে তার মাকে পানিও খাওয়ায়। এক পর্যায়ে নিস্তেজ হয়ে পড়লে আবার চাকু দিয়ে তার মাকে আঘাত করে হত্যা করে। হত্যার পর গৃহকর্মী সুমি শুধু তাকে লাশ বাথরুমে নিতে সাহায্য করে। স্বীকারোক্তিতে গৃহকর্মী সুমিও ঐশী একাই তার মা-বাবাকে হত্যা করেছে বলে জানিয়েছে।
    অন্যদিকে ঐশীর আইনজীবী এডভোকেট প্রকাশ রঞ্জন বিশ্বাস ও মাহাবুব হাসান রানা জানিয়েছেন, চাপ’ দিয়ে ও প্রলোভন দেখিয়ে ঐশীর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেয়া হয়েছে। তারা শনিবার ঐশীকে মানসিক ভারসাম্যহীন দাবি করে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থলে যেতে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের অনুমতি দিতেও আদালতের নির্দেশনা চেয়ে আবেদন করেন। এছাড়া ঐশীর পক্ষে জামিনেরও একটি আবেদন আদালতে দাখিল করেন। বিচারক ওই আবেদনগুলোর ওপর আগামী রবিবার শুনানির দিন ধার্য করেছে।
    এদিকে ঐশী ও কাজের মেয়ের আদালতে দেয়া স্বীকাররোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের জানাতে আজ শনিবার সন্ধ্যায় ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এ সংবাদ সম্মেলনে গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্মকমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ঐশী ও কাজের মেয়ে আদালতে স্বীকাররোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। জবানবন্দিতে ঐশী জানায়, সে নিজেই প্রথমে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে বাবা-মাকে অচেতন করে। পরে ছুরি দিয়ে তাদের হত্যা করে। বাবা-মাকে অচেতন করতে সে দুই ধরনের ৬০টি ওষুধ কফির সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়ায়। রাত ২টার দিকে প্রথমে মাকে পরে বাবাকে খুন করে সে। কাজের মেয়ে সুমি খুনের পর লাশগুলো সরাতে তাকে সহযোগিতা করে বলেও উল্লেখ করে সে।
    মনিরুল ইসলাম বলেন, যে দোকান থেকে ঐশী ঘুমের ওষুধগুলো কিনেছে তাদেরও চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে। তিনি বলেন, আদালতে ঐশীর এ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি খুনকে সম্পূর্ণ প্রমাণিত করে না। ঘটনাস্থলে পাওয়া আলামত ও তার সহযোগী ও আশ্রয়দাতাদের স্বীকারোক্তি পেলে আরও নিশ্চিত হওয়া যাবে। তবে ঘটনাস্থলে পাওয়া আলামতের ফরেনসিক রিপোর্ট, ঐশীর রক্তেমাখা কাপড়ের ডিএনএ টেস্ট আসলেই মূল ঘটনা জানতে পারবে পুলিশ। এছাড়াও ঐশীর আরও এক বন্ধুকে খুঁজছে পুলিশ। তাকে পেলে ঘটনার আরও বিষয় সম্পর্কে জানা যাবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
    অপরদিকে অপ্রাপ্ত বয়স্ক বিতর্কে ঐশীকে রিমান্ডে নেয়ার পর তা নিয়ে সারা দেশে ব্যপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এর পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার বয়স নির্ধারণের জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। এখনো পর্যন্ত এ সম্পর্কিত কোনো প্রতিবেদন পুলিশ বা আইনজীবীদের হাতে পৌঁছায়নি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
    ১৬ আগস্ট বিকেলে চামেলীবাগের বাসা থেকে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) পরিদর্শক মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমানের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরদিন তাদের মেয়ে রাজধানীর একটি ইংলিশ মিডিয়ামের ও লেভেলের ছাত্রী ঐশী পল্টন মডেল থানায় আত্মসমর্পণ করে। এ ঘটনায় তার সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে কিনা তা প্রমান করতে তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here