বিবিসির প্রতিবেদন : বাংলাদেশের পোশাকশিল্প: সস্তা শ্রমের বলি শ্রমিকরা

    1
    7

    ঢাকা, ২৭ এপ্রিল: বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা যারা পশ্চিমাদের জন্য কাপড় সেলাই করে তাদের মজুরি বিশ্বের যে কোনো দেশের চেয়ে কম। এর ওপর নানা দুর্ঘটনায় বারবার তাদের প্রাণ হারানোর ঘটনাও এখন একটা সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
    চলতি সপ্তাহে সাভারে ভবন ধসে নিহত হয়েছে প্রায় তিনশ শ্রমিক। অথচ এই দুর্ঘটনাটাও কিন্তু এড়ানো সম্ভব ছিল।
    সাভারের এই ধসে পড়া ভবনের কারখানাগুলো ইউরোপ ও আমেরিকায় পোশাক সরবরাহ করত। আটতলা ওই ভবনটির ফাটল অগ্রাহ্য করে শ্রমিকদের কাজে যোগদানে বাধ্য করে মালিক কর্তৃপক্ষ। ফলাফল আরো একটি গার্মেন্টস ট্র্যাজেডির জন্ম।
    এ সম্পর্কে ওয়ার অন ওয়ান্ট নামে আন্ত্মর্জাতিক দাতব্য প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ম্যুরে ওর্দে মনে করেন, বাংলাদেশে ভবনধসে শ্রমিকদের মৃত্যু একটি দুঃখজনক ঘটনা। তবে এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়। মাত্র পাঁচ মাস আগেই তাজরীন ফ্যাশনসে আগুন লেগে শতাধিক শ্রমিক নিহত হওয়ার পর আবারও শত শত শ্রমিক সামিল হলো মৃত্যুর মিছিলে।
    লেবার বিহাইন্ড দ্য লেবেল সংগঠনের নেতা সাম মাহেরস বলেন, ‘বাংলাদেশে অবৈধ স্থাপনা দখল করে গার্মেন্ট কারখানা বানানো খুবই সাধারণ ঘটনা। এসব ভবনের বেশিরভাগই এক একটি মৃত্যুফাঁদ। এগুলোতে বের হওয়ার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা রাখা হয় না। ফলে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনায় বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই।’
    এই সংগঠনটি বাংলাদেশে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং গার্মেন্টস ভবনের নিরাপত্তা উন্নতকরণে কাজ করে যাচ্ছে। সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে গার্মেন্টস ভবনগুলোতে পৃথক পরিদর্শন এবং শ্রমিকদের অধিকার সংক্রান্ত্ম প্রশিক্ষণের দাবি জানিয়ে আসছে। জার্মানির টিচিবো এবং যুক্তরাষ্ট্রের পিভিএইচ কোম্পানি তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে একটি চুক্তিও স্বাক্ষর করেছে।
    বাংলাদেশে পোশাক কারখানার শ্রমিকদের সিংহভাগই নারী। প্রতিদিন তাদের আট ঘণ্টা করে কাজ করার কথা রয়েছে। কিন্তু গুরম্নত্বপূর্ণ অর্ডার এলে তাদের প্রায়ই দিনে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত্ম কাজ করতে হয়। এমনকি ছুটির দিনেও কাজ করে তাদের কাজ শেষ করতে হয়।
    বিবিসির বাংলাদেশ প্রতিনিধি এনবারাসান ইথিরাজান বলেন, সুপারভাইজাররা শ্রমিকদের কড়া প্রহরায় রাখে। এমনকি যখন তারা টয়লেটে যায় তখনও।
    শ্রমমূল্যের প্রতিযোগিতা : বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পোশাক শিল্প অত্যন্ত্ম গুরম্নত্বপূর্ণ একটি খাত। দেশের মোট অভ্যন্ত্মরীণ উৎপাদনের ১৭ ভাগই আসে এই খাত থেকে যা মোট রপ্তানির এক তৃতীয়াংশেরও বেশি। বাংলাদেশে উৎপাদিত অধিকাংশ পোশাকই রপ্তানি হয় ইউরোপ ও আমেরিকায়।
    গত ৩০ বছরে দেশটিতে পোশাক শিল্পের রপ্তানি নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৮৫ সালে যখন এই শিল্পের যাত্রা শুরম্ন হয় তখন এ খাত থেকে আয়ের পরিমাণ ছিল একশ কোটির ডলারেরও কম। ২০১২ সালে এই অর্থের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় দুই হাজার কোটি মার্কিন ডলারে। আর এজন্য যারা ধন্যবাদ পেতে পারেন তারা হলেন, বাংলাদেশের শ্রমিকরা। সস্ত্মা শ্রমের কারণেই এখানে পোশাক শিল্পের এত রমরমা ব্যবসা।
    পোশাক শিল্পে বাংলাদেশের প্রবল প্রতিদ্বন্‌দ্বী ছিল চীন ও তাইওয়ান। কিন্তু চীনে শ্রমমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার পর বিদেশি কোম্পানিগুলো এখন সস্ত্মা শ্রমের আশায় বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকছে বলে জানান বাণিজ্য বিষয়ক বিদেশি অনলাইন পত্রিকা সোর্সি জার্নালের সম্পাদক অ্যাডওয়ার্ড হার্টজম্যান।
    তিনি বলেন, কাঁচামাল বা অন্য কোনো সুবিধার জন্য নয়। কেবল সস্ত্মাশ্রম। অনেক সময় দেখা যায়, চীন থেকে কাপড় কিনে বাংলাদেশে সেলাই করার জন্য পাঠানো হচ্ছে।
    ব্রিটেনের প্রিমার্ক, কানাডার লোবল এবং ডেনমার্কের পিডব্লিউটি কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে পোশাক নিচ্ছে। তবে এটি পরিষ্কার নয়, পশ্চিমের কোন কোন কোম্পানি এখানকার কারখানার পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
    এক বিবৃতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রিমার্ক জানায়, তারা কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের পোশাক কারখানার মান পর্যবেক্ষণ করছে। এমনকি তারা ভবনের পরিবেশ নিয়েও কাজ করছে বলে দাবি করে প্রিমার্ক।
    যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ একটি প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্ট। তারাও এখন বিশ্বের যেসব দেশ থেকে পোশাক নিচ্ছে সেগুলোর কারখানা ভবনগুলো যথাযথভাবে নির্মিত হয়েছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করে দেখছে।
    ওয়ালমার্ট বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের একটি বড় ক্রেতা। সম্প্রতি আশুলিয়ার তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডের পর এর সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করে মার্কিন এই কোম্পানিটি। ওয়ালমার্ট বলছে, তাদের না জানিয়ে তাজরীন ফ্যাক্টরিকে সাবকন্ট্রাক্ট দেয়া হয়েছিল।
    সোর্সি জার্নালের সম্পাদক অ্যাডওয়ার্ড হার্টজম্যান বলেন, এখন বেশ কিছু বিদেশি কোম্পানি তারা যেখান থেকে পোশাক নিচ্ছে সেগুলোর কারখানার পরিবেশের দিকে নজর দিয়েছে। আর সংবাদ মাধ্যমেও ফলাও করে প্রচারিত হচ্ছে পোশাক কারখানা এবং এর শ্রমিকদের নানা ঘটনাবলী।
    সম্প্রতি সাভারে ধসে পড়া ভবন ও কারখানার শ্রমিকদের মৃত্যুর খবর আন্ত্মর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলোতে গুরম্নত্বের সঙ্গে প্রচারিত হচ্ছে। তবে এ ব্যাপারে হার্টজম্যানের বক্তব্য হলো, রাতারাতি কোনো কিছুর পরিবর্তন সম্ভব নয়। কিন্তু এখন অনেক কোম্পানি কারখানা পরিদর্শনে লোক পাঠাচ্ছে। তবে এ ক্ষেত্রে সাবকন্ট্রাক্টের বিষয়টি নিয়ে সমস্যা রয়েই যাচ্ছে। কেননা এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কষ্টকর।
    এতকিছুর পরও একটা প্রশ্ন থেকে যায়। পশ্চিমা ক্রেতারা বাংলাদেশের মতো দেশগুলো থেকে কম পয়সায় টিশার্ট কেন কিনছে?
    ওয়ার অন ওয়ান্টের কর্মকর্তা ওর্দে মনে করেন, পোশাকের সামান্য কিছু মূল্য বেশি দিলে বাংলাদেশের শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা বাড়ানো সম্ভব।
    তিনি আকুতি জানিয়ে বলেন, যুক্তরাজ্যের মানুষের কাছে আমাদের সুপারিশ হলো, পোশাকের জন্য সামান্য কিছু অর্থ বেশি দিন অথবা সস্ত্মা পোশাকের বলি এইসব মানুষের মৃত্যু দেখতে থাকুন!
    এক্ষেত্রে তার যুক্তি হলো, ক্রেতারা যখন আওয়াজ তুলবে তখন বিদেশি কোম্পানিগুলো পোশাক কেনার ক্ষেত্রে তাদের সস্ত্মা শ্রমনীতি বদলাতে বাধ্য হবে।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here