আজ বিশ্ব মা দিবস

    0
    4

    ঢাকা, ১২ মে : আজ রবিবার বিশ্ব মা দিবস। মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানানোর দিন। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে দিবসটি। প্রতিবছর মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার বিশ্ব মা দিবস পালন করা হয়। জাতীয় পর্যায়ে এ দিবসে সামাজিক সংস্থা ও সংগঠন নানা আয়োজনে দিনটি পালন করে। আমাদের প্রথম শিক্ষক মা। মায়ের কাছেই প্রথম শেখে শিশুরা। জন্মের পর শিশুর প্রথম কান্নামেশা বুলিতেও জড়িয়ে থাকে মায়ের প্রতি দুর্নিবার আবেগ। মা ও শিশুর মমতা, আবেগ, ভালোবাসা সহজাত।
    মা ও শিশুর সম্পর্কের ব্যাখ্যায় বিজ্ঞান বলেন, মায়ের দুধে এক প্রকার রাসায়নিক যৌগিক পদার্থ আছে। মায়ের দুধপানের মধ্য দিয়েই শিশুর মাঝে প্রীতির নিবিড় বন্ধন তৈরি হয়। দেহের নিউট্রোপেট্রিক নামের একটি রাসায়নিক পদার্থ মায়ের মনে সন্তানের জন্য মমতার জন্ম দেয়। ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগে সন্তান মায়ের গর্ভে তিলে তিলে বড় হয় এবং মায়ের দেহ থেকেই খাদ্য গ্রহণ করে।
    মা ও সন্তানের চিরায়ত নাড়ির সম্পর্ক কোনো কিছু দিয়েই নিরূপণের বিষয় নয়। শিল্পীর কণ্ঠের গান সে কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় ‘মায়ের একধার দুধের দাম/কাটিয়া গায়ের চাম/পাপোশ বানাইলেও কভু শোধ হবে না। কিংবা, মায়ের মত আপন কেহ নাই/ মা জননী নাইরে যাহার ত্রিভুবনে তাহার কেহ নাই। অথবা মধুর আমার মায়ের হাসি চাঁদের মুখে ঝরে।’
    মনোবিজ্ঞানী মোহিত কামাল বলেন, মায়ের ভালোবাসা, অকৃত্রিম স্নেহ ও দরদ বিজ্ঞানের মাপকাঠি দিয়ে নির্ণয় করা সম্ভব নয়। মা ও শিশুর মধ্যেকার শাশ্বত বন্ধনই মানুষকে যৌথ জীবনচর্চায় এগিয়ে নিয়েছে।
    ইতিহাস : মা দিবস পালনের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। গ্রিক সভ্যতার সময়ও মা দিবস পালনের কথা জানা যায়। তখন গ্রিকবাসী তাদের সব দেবতার জন্মদাত্রী সিবেলিকে উৎসর্গ করে আয়োজন করত বিশেষ দিবসের। রোমান সভ্যতার সময়ও এ ধরনের উৎসব ছিল। সতেরো শতকে ইংল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডে পালন করা হতো মাদারিং সানডে নামে একটি ধর্মীয় উৎসব। এটি ছিল মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর ধর্মীয় আয়োজন। ১৮৫৮ সালের আগে পর্যন্ত এভাবে শুধু ধর্মীয় গণ্ডির মধ্যে থেকে মায়ের জন্য বিশেষভাবে কিছু করার উপলক্ষণগুলো সীমাবদ্ধ ছিল।
    যুক্তরাষ্ট্রে আনা জার্ভিস নামের এক নারী মায়েদের প্রাণিত করার মধ্য দিয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে স্বাস্থ্য সচেতন করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। এ কাজের মাধ্যমে তিনি মায়েদের কর্মদিবসের সূচনা করেন। ১৯০৫ সালে আনা জার্ভিস মারা গেলে তার মেয়ে আনা মারিয়া রিভস জার্ভিস মায়ের কাজকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য সচেষ্ট হন। ১৯০৭ সালের এক রবিবার আনা মারিয়া স্কুলের এক বক্তৃতায় মায়ের জন্য একটি দিবসের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেন। ১৯০৮ সালের ১০ মে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব ভার্জিনিয়ার গ্রাফইনের গির্জায় আনুষ্ঠানিকভাবে মা দিবস পালন শুরু হয়। ১৯১১ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি রাজ্যে মা দিবস পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। পরে ১৯১৪ সালের ৮ মে মার্কিন কংগ্রেস মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে মা দিবস হিসেবে ষোষণা করে।
    দেশে দেশে মা দিবস : ইউরোপের প্রতিটি দেশেই ঘটা করে পালন করা হয় মা দিবস। যুক্তরাষ্ট্রে এ দিন লাখো মানুষ মাকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানায় উপহার দেয়ার মধ্য দিয়ে। এক জরিপে জানা যায়, মা দিবসের সবচেয়ে বেশি আয়োজন থাকে যুক্তরাষ্ট্রে। কানাডা, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতেও আনুষ্ঠানিকভাবে মা দিবস পালন করা হয়। জাপানে মা দিবসের নাম ‘হাহা নো হি’। এর বাংলা অর্থ হলো ‘মায়ের জন্য ভালোবাসা’। আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতেও এ দিন নানা আনুষ্ঠানিকতা থাকে। ভারতে মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে মন্দিরগুলোতে উৎসব হয়। বাংলাদেশে দিবসটি ঘটা করে পালনের ইতিহাস খুব বেশি দিনের নয়। নাগরিক জীবনে দিনটি পালনের ক্ষেত্রে বেশি সাড়া মিলছে কয়েক বছর থেকে। গ্রামাঞ্চলের চেয়ে শহরে এ আয়োজন থাকে বেশি।
    ঢাকায় আজ বিভিন্ন শপিংমলে মায়ের জন্য উপহার সামগ্রী কিনতে ভিড় করবে সন্তানরা। মুঠোফোনে অনেকেই মাকে ভালোবাসা জানাবে। মায়ের জন্য শাড়ি, গহনা, ব্যবহারিক জিনিসপত্র উপহার দেবে তার প্রিয় সন্তানরা। মাকে উপযুক্ত সম্মান দেয়ার বিষয়টিও মা দিবসে নতুন করে সামনে আসে সন্তানের। যদিও দিবস পালন করে নয়, মায়ের প্রতি সহজাত ভালোবাসাই সন্তানকে টেনে নেয় মায়ের বুকে। তিনি নিঃর্শত ভাবেই নিজের সন্তানকে ভালোবেসে যান। মায়ের মতো এমন মমতাময়ী আর কে আছে এই পৃথিবীতে? মাকে জানায়, মা আমরা তোমাকে খুব ভালোবাসি। তুমি আরও অনেকদিন বেঁচে থেকো, তুমি ভালো থেকো মা। তবে একটা কথা, মা দিবস তো একটা প্রতীকি দিন। তাই মা দিবসেই শুধু নয়, মাকে ভালোবাসতে হবে বছরের বাকি দিনগুলিতেও।
    ত্রিভূবনের সবচেয়ে মধুরতম শব্দ কনিকা ‘মা’। এ ছোট্ট নামেই সব মমতার মধু মাখা। মা’র স্নেহ ভালোবাসাই কেবল এজগতে নিকষিত হেমের মত নিখাদ অকৃত্রিম এবং প্রতিদানহীন। কোন উপমা বা সংজ্ঞা দিয়ে মায়ের এ ভালোবাসার পরিধি ও গভীরতা পরিমাপ করা যায় না। মা উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে হৃদয়ের অতল গহীনে যে আবেগ ও অনুভূতি রচিত হয়, তাতে অনাবিল সুখের প্রশান্তি নেমে আসে।
    মা দিবস পালন নিয়ে উইকিপিডিয়া তুলে ধরেছে দুটি ইতিহাস।
    ‘মা দিবসের’ প্রচলন শুরু হয় প্রথম প্রাচীন গ্রীসে। সেখানে প্রতি বসন্তকালে একটি দিন দেবতাদের মা ‘রিয়া’ এর উদ্দেশে উদযাপন করা হতো। তবে বিশ্বে অন্যত্রও বিভিন্ন সময় ‘মা দিবস’ পালিত হতো বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। রোমানরা পালন করতেন ১৫ মার্চ থেকে ১৮ মার্চের মধ্যে। তারা দিনটিকে উৎসর্গ করেছিলেন ‘জুনো’র প্রতি। ষোড়শ শতাব্দী থেকে এই দিনটি যুক্তরাজ্যেও উদযাপন করা হতো ‘মাদারিং সানডে’ হিসেবে। ইস্টার সানডের ঠিক তিন সপ্তাহ আগের রবিবারে এটি পালন করেন তারা।
    সর্ব প্রথম ১৯১১ সালের মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার আমেরিকা জুড়ে মায়েদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে ‘মাদারিং সানডে’ নামে একটি বিশেষ দিন উদযাপন করা হয়। এর পর আমেরিকার চৌহদ্দি ছাড়িয়ে মা দিবসটি সার্বজনীন করে তোলার লক্ষ্যে এগিয়ে আসেন জুলিয়া ওয়ার্ড নামের এক আমেরিকান। মা দিবসকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেয়ার লক্ষ্যে ১৮৭২ সালে জুলিয়া ওয়ার্ড ব্যাপক লেখালেখি শুরু করেন। এরপর ১৮৭২ সালের মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার নিজের মায়ের মৃত্যুবার্ষিকীতে জুলিয়া ওয়ার্ড নিজে ‘মা দিবস’পালন করেন। ১৯১৪ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন দিবসটিকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেন। এরপর পৃথিবীর দেশে দেশে মা দিবসটি পালনের রেওয়াজ ছড়িয়ে পড়ে।
    পৃথিবীর সব দেশেই এই মা শব্দটিই কেবল সার্বজনীন। মা প্রথম কথা বলা শেখান বলেই মায়ের ভাষা হয় মাতৃভাষা। মা হচ্ছেন মমতা-নিরাপত্তা-অস্তিত্ব, নিশ্চয়তা ও আশ্রয়। মা সন্তানের অভিভাবক, পরিচালক, দার্শনিক, দিক-নির্দেশক, শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও বড় বন্ধু। সন্তানের প্রতি মায়ের এই তীব্র মমতা প্রসঙ্গে বিজ্ঞান বলে, মায়ের দুধে এক প্রকার রাসায়নিক যৌগিক পদার্থ আছে-যা সন্তানের দেহে প্রবেশ করলে মা ও সন্তানের মধ্যে চুম্বক প্রীতি ও সৌহার্দ্যরে নিবিড় বন্ধন রচিত হয়। মায়ের দেহে নউট্রোপেট্রিক রাসায়নিক পদার্থ থাকায় মায়ের মনের মধ্যে সন্তানের জন্য মমতা জন্ম নেয়। তবে মায়ের ভালোবাসার ক্ষমতা বিজ্ঞানের মাপকাঠিতে নির্ণয় করা সম্ভব নয়।
    একদিন নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এক সাহাবা জিজ্ঞাসা করলেন ‘আমার উপর সবচেয়ে বেশি অধিকার কার? রাসুলুল্লাহ(দ.)বললেন ‘তোমার মায়ের’। সাহাবী আবার জিজ্ঞাসা করলেন ‘আমার উপর সবচেয়ে বেশি অধিকার কার? রাসুলুল্লাহ(দ.)বললেন ‘তোমার মায়ের’। সাহাবা আবার জিজ্ঞাসা করলেন ‘আমার উপর সবচেয়ে বেশি অধিকার কার? রাসুলুল্লাহ(দ.)বললেন, ‘তোমার মায়ের’। সাহাবা আবার জিজ্ঞাসা করলেন ‘আমার উপর সবচেয়ে বেশি অধিকার কার? রাসুলুল্লাহ(দ.)বললেন ‘তোমার বাবার’।
    মাকে স্মরণ করে জগদ্বিখ্যাত মনীষী আব্রাহাম লিংকন বলেছিলেন, আমি যা কিছু পেয়েছি, যা কিছু হয়েছি, অথবা যা হতে আশা করি, তার জন্য আমি আমার মায়ের কাছে ঋণী। নেপলিয়নের সেই সার্বজনীন কথাটি খুব প্রসিদ্ধ, আমাকে একজন ভাল মা দাও, আমি তোমাদের একটি ভাল জাতি উপহার দেব।
    মাকে শ্রদ্ধা ও ভালবাসা জানানোর নির্দিষ্ট কোন দিন নেই। মায়ের প্রতি ভালবাসা প্রতিটি মুহূর্তের। তারপরও বিশ্বের সব মানুষ যাতে এক সঙ্গে মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারে সে জন্য আন্তর্জাতিক মা দিবস পালন করা হয়। প্রতিটি মায়ের মনের কথা যেমন, আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে। তেমনি প্রতিটি সন্তানের প্রতিদিনের ভাবনা ‘জননী আমার তুমি, পৃথিবী আমার, তোমার চরণ ছুঁয়ে বন্দনা গাই, হাজার বছর পরে যদি আমি আসি ফিরে তোমারী কোলেতে পাই যেন ঠাঁই, মা গো। বছরের প্রতিটি দিনই হোক মায়ের ভালোবাসা সমৃদ্ধ এ ধরনী। বিশ্ব মা দিবসে পৃথিবীর সব মাকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here